সরকারি ঋণ আপনার শত্রু না
সাংবাদিকরা যখন অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন, তখন তাদের গল্পটা মোটামুটি একই রকম হয়: সরকার "ক্রেডিট কার্ডের লিমিট শেষ করে ফেলেছে", সরকারি তহবিলে একটা "বিশাল গর্ত" তৈরি হয়েছে, আর আমাদের জাতীয় ঋণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিশাল এক বোঝার কারণ হবে।
এই গল্পটা এতবার বলা হয় যে মনে হয় এটাই সাধারণ জ্ঞান। কিন্তু রিচার্ড মারফির মতো অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধারণা শুধু ভুলই নয়, এটা রীতিমতো একটা "বিপজ্জনক কল্পকাহিনী"।
বাস্তবে, সরকারি ঋণ বেড়ে যাওয়া অর্থনৈতিক অসুস্থতার লক্ষণ নয়; বরং এটি প্রায়ই ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। জাতীয় ঋণ নিয়ে এই অহেতুক আতঙ্ক কেন আমাদের অর্থনীতি বোঝার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, আর কেন এই ঋণ আসলে আপনার সম্পদের জন্যই ভালো, সেটাই এখানে ব্যাখ্যা করছি।
সোজা কথা: ঋণ মানেই সম্পদ
এটা এমন এক হিসাববিজ্ঞানের বাস্তবতা যা নিয়ে রাজনীতিতে বা খবরের কাগজে খুব কমই আলোচনা হয়: সরকারি ঋণের প্রতিটি টাকা আসলে কারো না কারো ব্যক্তিগত সম্পদ (মানে, সরকার ছাড়া অন্য কারো কাছে থাকে, সেটা কোনো ব্যক্তি হতে পারে, কোম্পানি হতে পারে, পেনশন ফান্ড বা বিদেশী কোনো সংস্থা হতে পারে)।
অর্থনীতি চলে সেক্টরাল ব্যালেন্স বা খাতভিত্তিক ভারসাম্যের ওপর। সরকার যখন আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করে (মানে ঘাটতি বা ডেফিসিট রাখে), তখন সেই টাকাটা হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না। এটা নার্স, কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, বা বিদেশী সরবরাহকারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। তাই, সরকারি ঘাটতি মানেই সোজা কথায় বেসরকারি খাতের উদ্বৃত্ত।
ভারসাম্যের গোল্ডেন রুল
রিচার্ড মারফি যেমনটা বলেছেন, "প্রতিবার যখন সরকার তার ঋণ বাড়ায়, বেসরকারি খাত... আরও ধনী হয়।"
সরকার যদি তার সব ঋণ শোধ করে দিত, তাহলে অর্থনীতিতে ঘুরপাক খাওয়া প্রতিটি টাকা ট্যাক্স বা কর হিসেবে তুলে নিতে হতো। এতে করে ব্যক্তিগত সম্পদ ধ্বংস হয়ে যেত।
আমরা নিচের চার্টে এই সম্পর্কটা দেখতে পারি। টাকার প্রবাহ দেখায় যে সরকারি ঘাটতি মূলত বেসরকারি খাতের উদ্বৃত্ত টাকাটাই সরকারের কাছে যাওয়া।
আর তাই এই ঘাটতি থেকে যে "ঋণ" তৈরি হয়, তা আসলে বেসরকারি খাতের জমানো টাকা এবং সুদের সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই না।
আসলে এই "ঋণ"-এর মালিক কে?
সাধারণ ভয় হলো আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঋণের বোঝা রেখে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা তাদের জন্য সম্পদও রেখে যাচ্ছি। এই ঋণ দিয়ে যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে তা আমাদের নাতি-নাতনিরাই ব্যবহার করবে, আবার তারা বন্ডগুলোও উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে, মানে সোজা কথায় "এক গাদা ক্যাশ টাকা" পাবে।
এই ঋণ আসলে কারা ধরে রেখেছে সেটা বোঝা জরুরি। এটা শুধু অজানা কোনো বিদেশী সংস্থার হাতে নেই; এটা আমাদের নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি। যারা মূলত সরকারি বন্ড বা ঋণ কেনে তারা হলো:
- ব্যাংক: তারল্য বজায় রাখতে এবং আন্তঃব্যাংক লেনদেনের সুবিধার জন্য ব্যাংকগুলো সরকারি ঋণ ধরে রাখে। এর মধ্যে সুকুক বা অন্যান্য শরিয়াহ সম্মত বন্ডও থাকতে পারে।
- সঞ্চয়কারীরা: আপনার যদি সেভিংস অ্যাকাউন্ট বা ফিক্সড ডিপোজিট থাকে, আপনি সম্ভবত সরকারি ঋণের ওপর দেওয়া সুদ থেকেই লাভবান হচ্ছেন। আপনি যদি সরাসরি ট্রেজারি বন্ড কেনেন বা ফিক্সড ইনকাম ফান্ডে ইনভেস্ট করেন, তাহলে তো সরাসরিই সুবিধা পাচ্ছেন।
- পেনশন ফান্ড: অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন দেওয়া নিশ্চিত করতে এরা সরকারি বন্ড কেনে।
- ইনস্যুরেন্স কোম্পানি: দীর্ঘমেয়াদী ইনভেস্টমেন্ট ব্যাক আপ দিতে এবং প্রিমিয়াম কমাতে এরা সরকারি ঋণ ধরে রাখে।
আমরা যদি সব ঋণ "শোধ" করে ফেলি, তাহলে পেনশন ফান্ড বা ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো যে নিরাপদ অ্যাসেট বা সম্পদের ওপর নির্ভর করে, তা নাই হয়ে যাবে। এতে করে পুরো ফিনান্সিয়াল সিস্টেমেই ধস নামতে পারে।
MMT-এর দৃষ্টিতে: টাকা কোনো সমস্যা না
ঋণ কেন অর্থনীতির জন্য খারাপ না সেটা বুঝতে হলে দেখতে হবে টাকা আসলে কীভাবে তৈরি হয়। মডার্ন মনিটারি থিওরি (MMT) অনুযায়ী, সরকার কোনো গৃহস্থালী বা পরিবারের মতো না। খরচ করার জন্য সরকারকে আগে আয় করতে হয় না; সরকারই কারেন্সি বা মুদ্রা তৈরি করে।
এই বাস্তবতা আমাদের সাধারণ চিন্তাধারাকে উল্টে দেয়, যা নিচের চার্টে দেখা যাচ্ছে।
আগে খরচ: সরকারি খরচ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে নতুন টাকার জন্ম দেয়। খরচ করার জন্য সরকারকে কোষাগারে টাকা আছে কিনা তা দেখার দরকার নেই, যদি সরকারের অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকে তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনে ওভারড্রাফট দেবে।
পরে ট্যাক্স: ট্যাক্স বা কর নেওয়া হয় মূলত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, খরচ চালানোর জন্য না।
বন্ড একটা চয়েস: ঋণপত্র বা বন্ড ইস্যু করা হলো বেসরকারি খাতকে টাকা জমানোর একটা নিরাপদ জায়গা দেওয়া এবং সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করার একটা উপায় মাত্র।
অর্থনীতি বোঝার জন্য এই তিনটি কথা ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। সরকারই মুদ্রার একমাত্র সরবরাহকারী। যুক্তিগতভাবে, আমরা ট্যাক্স দেওয়ার টাকা পাওয়ার আগেই সরকারকে সেই টাকা খরচ করে (বা ধার দিয়ে) বাজারে ছাড়তে হবে। তাই, ট্যাক্স দিয়ে সরকার চলে, এই ধারণাটাই উল্টো।
সরকারি খরচের সীমাবদ্ধতা টাকার অভাবে নয়, বরং প্রকৃত সম্পদের (শ্রম, কাঁচামাল এবং প্রযুক্তি) অভাবে।
যতদিন অর্থনীতির "উৎপাদন ক্ষমতা" আছে, ততদিন সরকার "কেনাকাটা" (খরচ করা এবং ঋণ বাড়ানো) চালিয়ে যেতে পারে।
তবে, "উৎপাদন ক্ষমতা" আর "কেনাকাটা", এই শব্দগুলোর অনেক গভীর অর্থ আছে। অপ্রয়োজনীয় বা অনুৎপাদনশীল সরকারি খরচ কোনো কাজে আসে না; বরং এটা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, কারণ এতে বেসরকারি খরচ বা সম্পদ বাড়ে না (যা পরে ট্যাক্স বাড়াতে সাহায্য করতো)। তাই, অহেতুক কোনো টানেল বানানো সরকারি ঋণের ভালো ব্যবহার না। বরং এতে উল্টো সমস্যা হতে পারে কারণ এর থেকে লাভ খুব কম আসবে, আর খরচের বড় অংশ হয়তো বিদেশী সরবরাহকারীদের কাছে চলে যাবে, যারা সেই টাকা আমাদের দেশে আবার বিনিয়োগ করবে না। তখন আবার জিওপলিটিক্স আর আন্তর্জাতিক অর্থনীতির আলাপ চলে আসবে, যা নিয়ে আজ আর কথা বাড়াচ্ছি না।
ঋণ "ঠিক করা" বা শোধ করাই আসল বিপদ
ঋণ কমানোর বাতিক, যা প্রায়ই কৃচ্ছ্রসাধন বা অস্টেরিটির মাধ্যমে করা হয়, সেটাই আসলে আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি করে। কারণ সরকারি ঋণ মানেই ব্যক্তিগত সঞ্চয়, তাই সরকার যখন উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস করার চেষ্টা করে, তারা আসলে পরোক্ষভাবে বেসরকারি খাতের সঞ্চয় কমানোর চেষ্টা করে।
ঋণ "ঠিক" করতে গিয়ে রাজনীতিবিদরা যখন খরচ কমায়, তখন এর ফল হয় খুব খারাপ:
- হাসপাতাল আর স্কুলগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।
- বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
- এনার্জি ট্রানজিশন বা বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে ফান্ড থাকে না।
ঋণকে মাথাব্যথা হিসেবে না দেখে আমাদের উচিত একে একটা টুল বা হাতিয়ার হিসেবে দেখা। অলস পড়ে থাকা সঞ্চয়কে আমরা বন্ডের মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে হাসপাতাল বানানো, কর্মীদের ট্রেনিং দেওয়া এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গড়ার মতো উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে পারি।
শেষ কথা
পরের বার যখন শুনবেন জাতীয় ঋণের "ভয়াবহ বোঝা" নিয়ে কেউ সাবধান করছে, তখন ব্যালেন্স শিটের অন্য পাশটার কথা মনে করবেন। এই ঋণই আপনার পেনশন ফান্ডের সঞ্চয়, ব্যাংকের তারল্য, আর অর্থনীতিতে সচল থাকা টাকা।
আমাদের এই ঋণ ধ্বংস করার চেষ্টা করা উচিত না; বরং একে ব্যবহার করে একটা সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের সেতু তৈরি করা উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে "ঋণ" পাবে, তার বিপরীতে যেন তারা পায় উন্নত ইনফ্রাস্ট্রাকচার আর একটা চাঙ্গা অর্থনীতি।